প্রচলিত ব্যবস্থায় অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তির অভিযোগ জিএইচজি প্রটোকলের

বৈশ্বিক জায়ান্টদের কার্বন নিঃসরণের সঠিক মাত্রা নির্ধারণে হিসাবরক্ষণ পদ্ধতিতে সংস্কারের প্রস্তাব

ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট ও জেনেভাভিত্তিক ২২৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে নিয়ে গড়ে তোলা জোট ওয়ার্ল্ড বিজনেস কাউন্সিল ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত গ্রিনহাউজ গ্যাস প্রটোকল (জিএইচজি প্রটোকল)।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট ও জেনেভাভিত্তিক ২২৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে নিয়ে গড়ে তোলা জোট ওয়ার্ল্ড বিজনেস কাউন্সিল ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত গ্রিনহাউজ গ্যাস প্রটোকল (জিএইচজি প্রটোকল)। বিভিন্ন কোম্পানির হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় কার্বন ফুটপ্রিন্টের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি উদ্ভাবন ও তা পর্যালোচনা করে সংস্থাটি। জিএইচজি প্রটোকল এখন বিভিন্ন খাতের বৈশ্বিক জায়ান্টদের কার্বন ফুটপ্রিন্টের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। এজন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মার্কিন অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডসে (আইএফআরএস) নির্দেশিত হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রচলিত হিসাবরক্ষণ পদ্ধতিতে কোম্পানিগুলোর কার্বন ফুটপ্রিন্টের তথ্য সংরক্ষণে এখনো অনেক ধরনের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে বলে মনে করছে জিএইচজি প্রেটোকল। বিশেষ করে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক প্রকট বলে মনে করছে সংস্থাটি। খবর এফটি।

বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর নতুন নতুন উদ্ভাবন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতি ও ডাটা সেন্টার অবকাঠামো পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর। জিএইচজি প্রটোকলের ভাষ্যমতে, কোম্পানিগুলো অনেক বেশি মাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর রয়ে গেছে এখনো। শুধু রিনিউয়েবল এনার্জি ক্রেডিট (আরইসি) ক্রয়ের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ থেকে নিজেদের দায় এড়াচ্ছে। এ বিষয়ে অবিলম্বে নীতি সংস্কারের প্রয়োজন, যাতে কোম্পানিগুলোর কার্বন নিঃসরণের হিসাব আরো স্পষ্টভাবে জানা যায়।

প্রযুক্তি কোম্পানিসহ বৈশ্বিক জায়ান্টগুলোর কার্বন নিঃসরণ রোধে তথ্য প্রকাশে হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় সংস্কারের মাধ্যমে কঠোর নীতি গ্রহণের প্রস্তাব করেছে জিএইচজি প্রটোকল। এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে অ্যামাজন ও মেটার মতো বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর জন্য জলবায়ু লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি সপ্তাহেই বিদ্যুৎ খাতের কার্বন নিঃসরণ পরিমাপে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে জিএইচজি প্রটোকল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিবর্তন প্রযুক্তি, শিল্প ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগসংক্রান্ত হিসাবের ধরনকেই পাল্টে দিতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত দূষণ ঘটালেও বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দাবি করতে পারছে যে তারা শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য অর্জনের পথে রয়েছে। যদিও তাদের এআই ডাটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে দূষণ বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আরইসি কেনার মাধ্যমে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো দাবি করে, তারা বায়ু, সৌর ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। কার্বন ক্রেডিট কেনার এ সনদের দাম ও মানে ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে।

এ বিষয়ে জিএইচজি প্রটোকলের এক প্রতিবেদনে উদাহরণ টেনে বলা হয়, ‘ধরে নেয়া যাক, টেক্সাসে একটি প্রযুক্তি কোম্পানির ডাটা সেন্টারে রাতে শুধু গ্যাস পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটি এর বিপরীতে ক্যালিফোর্নিয়ায় দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ কেনার সময় পাওয়া সনদকে কাজে লাগিয়ে নিজের গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকে সমন্বয় করে দেখাতে পারছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি দেখাতে পারছে, টেক্সাসে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ রয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় বিনিয়োগের কারণে একই পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কম হয়েছে। অথচ বাস্তবে এ দুই মার্কিন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বিদ্যুৎ লেনদেন হয় না। জিএইচজি প্রটোকল এ ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।’

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এসব কোম্পানির অ্যাকাউন্টিং ব্যবস্থায় উভয় ধরনের বিদ্যুতের কার্বন নিঃসরণকে সমন্বিতভাবে দেখাতে হলে এগুলোকে একই সময়ে এবং একই বাজারে উৎপাদন হওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের তথ্যের মধ্যে ‘বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক’ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের তথ্য নির্ভুল, তুলনাযোগ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকরও হবে।

জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভিয়েটের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল আর্নেসন বলেন, ‘এ প্রস্তাব কার্যকর হলে দাম ওঠানামার নিশ্চিত একটি ধারা দেখা যাবে। অর্থাৎ যেদিন বা যে সময়ে বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হবে, সে সময় সনদ কিনতে হলে দাম বেশি দিতে হবে। বৈশ্বিক পরিসরে এটি রিনিউয়েবল এনার্জি ক্রেডিটস ক্রয়কে আরো ব্যয়বহুল করে তুলবে।’

এর আগে অ্যামাজন, মেটা, সেলসফোর্স, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জিএইচজি প্রটোকলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্ত ছিল। এখন মানদণ্ড সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়ায় করপোরেট লবিং তীব্র হয়ে উঠেছে।

গুগল ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো অল্প কয়েকটি কোম্পানি জিএইচজি প্রটোকলের এ নতুন ও ব্যয়বহুল নিয়মকে সমর্থন করেছে। এ নিয়মে কোম্পানির ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগকৃত নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের হিসাব তুলনামূলক ব্যয়বহুল সার্বক্ষণিক আওয়ার ম্যাচিং পদ্ধতিতে ও অঞ্চলভিত্তিক হিসেবে প্রকাশ করা হবে। অন্যদিকে মেটা, অ্যামাজন, জেনারেল মোটরসসহ একটি জোট আরো নমনীয় পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তাদের মতে, এ বিষয়ে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করলে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বেশি বিনিয়োগ হবে। তারা এমন এক পদ্ধতির প্রস্তাবও দিয়েছে, যাতে বিনিয়োগের কারণে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ এড়ানো গেছে, সেটিকেও যেন হিসাবভুক্ত করা যায়। তাদের এসব প্রস্তাব জিএইচজি প্রটোকল আলাদাভাবে বিবেচনা করছে।

সম্প্রতি মাইক্রোসফট, মেটা, গুগল ও অ্যামাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন মার্কিন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো হিসাবের ক্ষেত্রে এমন কৌশল ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে নিজেদের জলবায়ুবান্ধব নীতির পক্ষে দেখাচ্ছে তারা। এটি বিভ্রান্তিকর। অথচ কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা স্থানীয় গ্রিডেও চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে।

জিএইচজি প্রটোকলের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আর্থিক হিসাবের মাধ্যম পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি। বর্তমানে ইইউ, চীন ও অন্যান্য অঞ্চলে বৈশ্বিক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ কার্বন ট্যাক্স পরিশোধ করবে, তা এ পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জলবায়ু লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্ল্যাকরকের গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স, জ্বালানি কোম্পানি এক্সনমোবিল, অ্যাডনকসহ একাধিক কোম্পানি ঘোষণা দিয়েছে, উন্নততর কার্বন নিঃসরণ হিসাব কাঠামো তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো।

আরও